dialogue versed story


                                         আফরিন

"আমি আফরিন l বয়েস বারোl বাড়ি মুর্শিদাবাদ এর নয়ডাঙ্গায় l আব্বার নাম মজনু আলী l আম্মার নাম তো কোইতে নাই.... !"
" তুমি একা একা কলকাতায় চলে এলে কি করে?"
"একা একা তো আসি নাই l আমার এক মাসি এখানে কাজ করে lআম্মুকে বলেছিলো আমায় রোজগার এর ব্যবস্থা করে দেবে, তাই লালগোলা টেরেন ধরে এই দুই হপ্তা আগে এ জায়গাটাতে এসেছিলাম l"
-"তুমি জানো এই জায়গাটার নাম কি?"
‘’না না, আমি এই প্রথম কলকাতায় এলাম lআগে ইস্কুলে যখন পড়তাম বই কলকাতার নাম পড়েছি,পথম দেখলাম,কি বড় শহর,কতও গাড়ি... !"
"কোন ক্লাস এ পড়ো?  "
‘’পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছি সেই কবে!বাড়িতে সব মিলিয়ে পাঁচ ভাইবোন l চাচা চাচীরাও আমাদের সাথে থাকে l তাই ক্লাস 4 অবধি পড়েই আর পড়িনি l লোকের বাড়িতে কাজ করতাম l"
"আচ্ছা, তা তোমার মাসি এখন কোথায় জানো? "
"না, আমারে কইলো দিন কতক এই বাড়িতে থাকতে, বাড়ীর লোকেরা সব কাজ কাম শিখিয়ে পরিয়ে নিবে,পরে এসে মাসি আবার অন্য জায়গায় নিয়ে যাবে !"
"ঠিক আছে lতুমি আমায় বলতো এই কদিন তুমি যে এই বাড়িতে ছিলে, তোমার কেমন লেগেছে? "
"বা রে, খারাপ লাগবে কেন? ভালো লেগেছে l এখানে অনেক দিদি দাদা আছে, তারা কি সুন্দর ডেরেস পরে,গয়না পরে, কি সুন্দর হেসে হেসে কথা কয়, কতো লোক আসে এখানে l ঘরগুলো কি দারুন l এটা বুঝি অনেক বড়োলোক এর বাড়ি? এখানে একজন ঠাম্মা আছে, সে আমায় বলেছে ভালো করে নাচতে আর গাইতে পারলে আমিও অমন করে সাজতে পারবো, পয়সা পাব, সেই পয়সা দিয়ে জিনিস কিনে বাড়িতে পাঠাবো l"
"তুমি পারো নাচতে গাইতে? "
"এই সবে শিখছি l এট্টু লজ্জা লাগে, জানো তো, আগে তো কোনোদিন করিনি এমন তাই !!আচ্ছা, এরা কি সিনেমার লোক? দেব, কোয়েল এর বই দেখতে আমার খুব ভালো লাগে !!!"
"আর কি ভালো লাগে তোমার?"
"উমম, আমি ভালো রাঁধতে পারি!"
"ও আচ্ছা !!"
"তোমার নাম কি দাদা?"
"আমি অনিরুদ্ধ, অনিরুদ্ধ দাশগুপ্ত l"
"তুমি কলকাতায় থাকো? "
"হ্যাঁ, এখানকার একটা কলেজে পড়ি, আমার বাড়ি দমদম l"
"আমি কোনো জায়গাই চিনিনা যদিও !ঠাম্মা আমায় বলল তোমাকে নাচ দেখাতে হবে, তুমি খুশি হলে টাকা পাব l"
"নাচ? ও.... হ্যাঁ....তুমি গানও শোনাতে পারো l"
"হিন্দি গানই শিখিয়েছে আমায় দিদিরা, তাই গাইবো? "
"কি গান শিখিয়েছে? "
" বিড়ি যা লাই লে....জিগার সে পিয়া....  "
"থাক থাক.... আর গাইতে হবেনা!"
"এ মা যা, আসলে আমি বড়ো বাজে গাই..."
"না বাজে গাও না আসলে  তা নয় ব্যাপার টা... "
"তবে থামতে বললে যে? "
"দাড়াও একটু, আমি ফোন টা একটু রিসিভ করে নি, তারপর আসছি.... "
"আচ্ছা... "
......."হেলো.... অনি, কি ব্যাপার গুরু? ভাবে বিভোর তুমি?ফুলটুস মস্তি করছিস বল বে?বলেই ছিলাম তোকে....জন্মদিন এ এমন ট্রিট দেবো যে জাস্ট দেখতে রেহ যাও গে!!!কি রে চুপচাপ আছিস কেন? বল বল, আইটেম পছন্দ হয়েছে?ছুড়ি না বুড়ি? "
"তু্ই থামবি গাম্বাট, আমি আগেই বলেছিলাম আমি আসবোনা এখানে, তু্ই জোর করে খাইয়ে এখানে নিয়ে আসলি l ধুর... ভালো লাগছেনা এখানে আমার !"
"ভাই, দুই ঘন্টা ফুল পেমেন্ট করে দিয়েছি আমি আর সুতনু , এখন বেরোনো যাবেনা lভাই তু্ই এমন ভাব করছিস যেন কোনোদিন মেয়ে ছুঁয়ে দেখিসনি? বললাম তোহ শ্রীনিকা জানতে পারবেনা কিসসু,ট্রাস্ট মি ব্রো!"
"উফফফ, সেসব না, তু্ই জানিস যে মেয়েটাকে আমার ঘরে পাঠিয়েছে তার বয়েস বারো, আমার বোনের বয়েসী l কি করবো আমি? "
"ও আমার চাঁদু রে, ওই বয়েস এর মেয়েদের ডিমান্ড বেশি বুঝিসনা? তু্ই সংযম করছিস নাকি? সন্ন্যাস নিবি?বেকার ভাটাচ্ছিস কেনো?এনজয় কর l"
"আমার আদর্শ আর বিবেকে বাঁধছে ভাই l জানাজানি হওয়ার ভয় আছে আবার..... এসব করা ঠিক না...শুভ!!"
"বাহ্ বাহ্,দুই বছরে পাঁচটা মেয়ের সাথে চড়ে বেড়াবার সময় তোর আদর্শগুলো কি তাকে তোলা ছিল বুঝি? জন্মদিন এ এসে বোধ উদয় হলো তোর? শালা!এই শোন্, যা করার কর তু্ই, আমি কাটলাম l বেবি ফোন করছে আমায় l"
.........”হা এসে গেছি।‘’
“হান,তোমার ফোনটা কি সুন্দর দাদা...জুলিদি আমায় বলেছে ভাল করে কাজ করতে পারলে আমারো এমন ফোন হবে।‘’
“হুম। তোমার বাবা মা কে দেখতে ইচ্ছে করেনা? ‘’
“করে না আবার?কিন্তু এই কাজে নাকি বেশি ছুটি ছাটা পাওয়া যায়নাতাছাড়া এখন তো সব কাজ শেখাও হয়নি ,যদিও আমি ঠিক বুঝতে পারছিনা নাচগান করে এতো পয়সা পাওয়া যাবে যা দিয়ে এমন সুন্দর পরদা ঘেরা বাড়ি তৈরি করা যায়? তুমি বল যায়? ‘’
“আমি তো জানিনাশোন তোমাকে দিদিরা ঠিকঠাক করে খেতে দেয় তো?’’
‘’হান,দেয়,তবে সেগুলো খেতে খুব একটা ভালোনা।আমার আম্মুর মতন তো একেবারেই না।‘’
‘’বকে মারে না তো কেউ?’’
‘’আমায় এখন কেউ মারেনি যদিও তবে কাল দেখছিলাম একটা দিদিকে খুব মারছিল।জিজ্ঞেস করায় বলল কাজে মন না দেওয়াও ওকে মেরেছে। সে মারবেই তাই না বল? আগে যে বাড়িতে কাজ করতাম সেখানে একদিন হাত থেকে কাঁচের বাটি ভেঙ্গে পরে গেছল,গিন্নিমা চটি দিয়ে মেরেছিল আমারে,আব্বাজান রে বললাম সে কথা খানা বলে কিনা মনিব এর হাতের মার সজহি করতে হয় বেটি, নয়লে কাজ শেখা যায়না। “
“এই জন্য কাজ ছেড়ে দিলে বুঝি?মারাটা খুব অন্যায় কাজ আর তোমার মতন বাচ্চা মেয়েদের দিয়ে কাজ করানও অন্যায় ।“
“এই কাজ তো আমার অনেক বান্ধবীরাও করে।অন্যায় হতে যাবে কেন?খেটে পয়সা নি তো ?’’
“ছাড়,এসব তুমি বুঝবে না এখনি, সময় হলে বুঝবে?”
“বুঝব।বলনা আমায়?”
“পরে একদিন না হয় বোঝাবো। আজ আসি। কেমন?পরে দেখা হবে?’’
‘’আচ্ছা,দাদা। তুমি যে আমার সাথে গল্প করলে,আমার খুব ভালো লাগলোপরেরবার তোমায় একটা ভালো গান শোনাব কেমন?’’
“রবীন্দ্রসংগীত শোনাস না হয়?”
“আচ্ছা,বলব তাই শেখাতে।‘’
..................’’অনি, এত তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এলি, শুভ বলছিল তোর নাকি এসব পোষাচ্ছে না, আগে বললেই পারতিস,টাকা গুলো মায়ের ভোগে গেল।কি রে তুই ফোন এ কি করছিস?’’
‘’আমায় এখুনি মামুর কাছে যেতে হবে, এই বেসামাল অবস্থায় তুই যদি গাড়ি চালাস,আমার জন্মদিন আর মৃত্যুদিন সেম তারিখে হবে,আর আমি সেটা চাইনা।তোরা যাবি আমার সাথে , ক্যাব বুক করছি?’’
“তোর মামু তো,ইয়ে...মানে তুই এই ভাবে এখন ওখানে যাবি?না বাওয়া আমরা যাচ্ছিনা। শুভও যাবেনা, আমি জানি। ও ফোনে ব্যস্ত আছে, শুনবো?’’
‘’না থাক !’’
‘’তুই কেন যাবি ওখানে এখন স্পষ্ট করে বলবি?’’
‘’বলতে পারিস পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে!!!”
“মানে?”
“সময় হলেই জানতে পারবি...আমি আসি রে!”

******(দুই দিন পর।)
“আপনি মজনু আলি?আফরিন এর বাবা?”
“হাঁ হুজুর,আমার বেটির কিছু হয় নায় তো?”
“ভাগ্য ভালো যে কিছু হয়নি,তবে আর দু একদিন এর মাথায় কিছু হয়ে যেত!”
“আফরিন কোথায় সার?’’
“পাশের ঘরে আছে।আপনি জানতেন না আফরিন এর ওই মাসি ওকে কোথায় কাজে নিয়ে যাচ্ছিলো?”
“বিশ্বাস করুন সার,আমি জানতুম না ও একটা নোংরা মেয়েছেলে,ভেবেছিলাম কলকাতায় গিয়ে মাইয়াটা সুখে থাকবে,সংসারে টাকা আসবে। নিজে রোজগার করতে পারবে ।ভেবেছিলাম পরে ভালো দেইখা একটা শাদি দেব ওর। কি থেকে কি হয়ে গেল আমার আল্লা!”
‘’আসলে ওরা এখনও আফরিন কে পাকাপাকিভাবে ধান্দায় নামায়নি,ওর ট্রেনিং চলছিল।আর কদিন পরেই ওকে পাচার করে দিত কোথাও।এসব এর পিছনে বড় একটা চক্র  কাজ করে,ওর মাসি মেয়ে জোগাড় করে দেয় মাত্র।তবে শারীরিক কোনও অত্যাচার হয়নি ওর উপর তেমন।আমার বোনপো এর কাছ থেকে খবর পাওয়া মাত্র আমরা তল্লাশি শুরু করি,খবর পাঠাই আপনার কাছে, কমপ্লেন জমা না করা অবধি পুলিশ নিজে থেকে যেচে তো কাজ করেনা,তাও যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি । প্রতেকদিন বহু মেয়ে এভাবে র‍্যাকেট এর খপ্পরে পরে বাইরে চালান হয়ে যায়, সব জেনেও আমরা কিছু করতে পারিনা!!!!”
“সার আপনার জন্য আজ আমার মেয়ে কে ফিরে পেলাম সার...”
“ধন্যবাদ দিতে হলে অনি কে দিন। ও পাশের ঘরে আফরিন এর সঙ্গেই আছে...সব বোঝার পর থেকে ও ঘাবড়ে গেছিল বেশ। হঠাৎ ওই এলাকায় গিয়ে ঘেরাও করে উদ্ধার করা ,বুঝবেন না এসব ব্যাপার আপনি,অনেক রকম চাপ থাকে আমাদের ওপর যা বাইরে থেকে আঁচ করা দুষ্কর!!”
...............’’আফরিন বেটি....’’
...‘’আব্বু জানো তো কি হতে যাচ্ছিলো?’’
‘’জানি রে মা,আজ এনারা না থাকলে তোর সাথে আর কোনও দিন দেখাই হতনা। বাড়ি ফিরে চল ,এসব কাজকাম করে আর কোনও কাজ নেই!”
“হাঁ ,আমি বাড়ি ফিরে যাব,আবার পড়াশোনা আরম্ভ করবো”
‘’পড়াশোনা??তোর শাদি দেব ভাবতেছিলাম!!!”
“না আব্বু,আমি পড়বো । এই অনি দাদা বলেছে আমায় পড়াশোনা করে নিজের পায়ে দাঁড়ালে কেউ এভাবে আমাদের মতন গরিব মানুষ দের ঠকাতে পারবেনা ।“
“জানি রে মা কিন্তু অনিবাবু আমাদের সাধ থাকলেও সাধ্য যে নেই, চাই তহ পড়াতে কিন্তু নুন আনতে পান্তা ফুরায় যে সংসারে সেখানে পড়াশোনা...?”
“আফরিন আমার বোন এর বয়েসি।ওকে সেদিন ওখানে প্রথম দেখে,ওর সাথে কথা বলেই ব্যাপার টা ধরতে পারি,আমার বোন এর মুখ টা বারবার মনে পরে যাছিল !! যাই হোক,বোন যখন বলেইছি দাদা হিসাবে আমারও কিছু কর্তব্য আছে। চিন্তা করবেন না কাকু, ওর পড়াশোনার ব্যাবস্থাও আমি করে দেবো।কি রে আফরিন বুঝলি তো ?”
“হাঁ দাদা, আজ তোমার কথা টা সত্যিই বুঝেছি !!”


Image result for a girl in red light area