ক রো না ম চা
#LOCKDOWN~1
বিস্ময় আর হতাশায় হাঁ হয়ে যাওয়ার মধ্যে একটা
বিশাল পার্থক্য আছে।
আমরা
সবাই এখন যুগপৎ ভাবে সেই অবস্থায় বিরাজমান। প্রত্যেকটা মুহূর্ত
কাটছে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে
তাকিয়ে।দিন নেই রাত নেই টিভি কিম্বা ফোনের পরদায় চোখ রাখছি কম বেশি আমরা সকলেই
।যেন খেলার স্কোরকার্ডে চোখ বুলিয়ে দেখে নিচ্ছি কজন আক্রান্ত হলেন এই মারণ ভাইরাসে,কজনকেই
বা আমরা চিরতরে হারালাম। আমার জেলার গণ্ডি পেরিয়ে আমার রাজ্যের সীমানা ছাড়িয়ে আমার
দেশ তথা এই বিশ্বের করোনা-পরিসংখ্যান (সেটা ঠিক কতটা কমিয়ে বলতে চাওয়া হয়েছে সেই
বিতর্কিত প্রসঙ্গে না হয় নাই বা গেলাম!) প্রতিক্ষণে কতটা বিবর্ধিত হচ্ছে সে নিয়ে
আতঙ্কিত হচ্ছি কম বেশি সবাই। এক অদৃশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে নেমেছি এ খেলায়,কে জিতবে,কে
কাকে ক’ গোল দিয়ে হারাবে নিরন্তর জল্পনা কল্পনা চলছে তামাম দুনিয়ায়,আর আমরাও লকডাউনের
এই মরশুমে এ বিষয়ে নিজেদের গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছি (টুকরো টাকরা তথ্য সংগ্রহ আর
ফরওয়ার্ডেড মেসেজ এর দৌলতে),নিজেকে নিয়োজিত রাখছি দেশের দিকে ধেয়ে আসা আগাম বিপদের
সম্ভাব্য সমাধান এর অন্বেষণে । কোনও কোনও বীর পুঙ্গব তো ঘরবন্দি থাকতে খুবই
অনিচ্ছুক, “ মন্বন্তরে মরিনি আমরা মারি নিয়ে ঘর করি” সত্যেন দত্তের এই বুলি আউড়ে
বিনা মুখোশেই বেরিয়ে পড়ছেন অহরহ রাস্তায় কারুর সাবধান বাণীর তোয়াক্কা না করে! “
করোনা ব্যাটা আমার কিস্যু করতে পারবেনা” তাঁদের একাংশের মত।কেউ বা এক কাঠি উপরে
“হওয়ার থাকলে এমনিই হবে, এত সাবধান হয়ে লাভ কি?চা খেতেও কি আসবনা? আড্ডা মিস করা
যায় নাকি ?” তাঁদের জন্য ইতালি আর আমেরিকার উদাহরণই ‘কাফি হ্যায় মেরে দোস্ত’। ওরাও এমন attitude
প্রদর্শন করেছিলেন , ওদের ওই দাম্ভিকতা মানিয়েও ছিল বেশ আর যাই হোক চিকিৎসা
পরিকাঠামোতে তারা বরাবরই ফার্স্ট বেঞ্চার। কিন্তু সে সব অতি উন্নত দেশে যখন দিনে
রেকর্ড সংখ্যক লোক আক্রান্ত হচ্ছেন তখন আমাদের এই পোড়া দেশে ঠিক কি হাল হতে পারে
ভাবলে ভয় লাগে বইকি! ভয় লাগছে অনেক কিছু ভেবেই। যারা আমাদের সুস্থ করে তোলার
দায়িত্বে বহাল, উপযুক্ত পিপিই এর অভাবে বা অসর্তকতাবশত তারাই যদি করোনায় কাবু হয়ে
পরেন তখন বাকিদের বাঁচাবে কে? এমনিই ভারতে চিকিৎসকের আকাল,ঘুণধরা স্বাস্থ্য
পরিষেবা। দিন আনি দিন খাই মানুষের
কাছে অনাহারে মরা আর করোনাতে মরার মধ্যে
বিশেষ প্রভেদ নেই তাই তারা অনেকেই পেটের দায়ে বেরিয়ে পড়ছেন নিরুপায় হয়েই। বাজার যদিও খোলা
নির্দিষ্ট সময় পরজন্ত,কিন্তু যাদের হাতে টাকা আছে তাঁরা কিছুটা ভীত হয়েই অনেক বেশি
পরিমাণে জিনিস কিনে মজুত করে রাখছেন এর ফলে যাদের সত্যিই প্রয়োজনীয় সামগ্রী কেনাটা
দরকার তাঁরা পাচ্ছেন না ;এদিকে কাজও নেই,গচ্ছিত সম্পদের ভাঁড়ারে টান এভাবে কতদিন
বাঁচা যায়?আর “ওরা” যদি বসে যায়
সম্পূর্ণভাবে সমাজের বাকিসব স্তরেও যে কম্পন অনুভূত হতে বাধ্য!রেশন এর বিনামূল্যে
বিতরিত খাদ্যসামগ্রী সবার কাছে পৌঁছাচ্ছেনা এ তো সবার জানা। আর সেসব খাবারের মান
নিয়েও প্রশ্নচিহ্ন রয়েই যায়...। এই দুর্দিনে বহু ‘সহৃদয়’ মানুষ যারা ‘গরীবদের
নানাবিধভাবে সাহায্য করে“ সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজেদের এই মহানুভবতার সাক্ষ্যপ্রমাণ
উপস্থাপন করছেন এই বয়ানে “ আমরা দেখাতে চাইনা তাও দেখাচ্ছি আপনাদেরকে যাতে আমাদের
দেখে আপনারাও দিন “ তাঁদের কাছে করজোড়ে নিবেদন “লোকদেখানো“টা সবার স্বভাব নয়,
বিবেকবান মানুষরা এহেন পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে যে যার সাধ্যমত দিচ্ছেন, সরকারের
তহবিলেই হোক কিম্বা নিজে থেকে উদ্যোগ নিয়েই হোক,সুতরাং নিজের ঢাক নিজে পেটানোর যে ‘সুঅভ্যেসটি’
রপ্ত করেছেন ‘অন্যেদের’ দেখাদেখি তা কিছুদিনের জন্য না হয় মুলতুবিই রাখলেন !
ছোঁয়াচে রোগ সবসময়ই দুশ্চিন্তার উদ্রেক
ঘটায়,পূর্বতন প্লেগই হোক বা নবাগত করোনা,কিন্তু এর সংক্রমন এতটাই স্পিডে হয় যে ১
দিনের মধ্যে প্রায় এক হাজার জন করে লাফিয়ে লাফিয়ে যে সংক্রামিতের সংখ্যাটা বেড়েই
চলেছে- আমাদের ভারতে এটা যে পরবর্তীতে ভয়াবহ রূপ নেবেনা তার কোনও নিশ্চয়তা কি আছে?
নেই...! ঘণ্টা থালি বাজিয়ে কিম্বা অকাল দিওয়ালির আয়োজন করে মানুষকে সাময়িকভাবে
হয়তো খুশি করা যেতে পারে,এই“ইনফ্যানটালাইজেশন” যে বেশিদিন টিকবেনা সে আঁচ করতে
পেরেছেন বলেই হয়তো তড়িঘড়ি নিজেদের নাক উঁচু ভাবটাকে তাকে তুলে রেখে রুমালে নাক
চাপা দিয়ে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীদের সাথে ভিডিও কলে বসতেই হল অগত্যা লকডাউনের মেয়াদ
বৃদ্ধি ও অতিমারিজনিত অন্যান্য সমস্যা নিয়ে আলোচনা করতে ।
এ
প্রসঙ্গে বলে রাখা ভাল যে ২০০৪ সালে সুনামির পর ২০০৫ এ বিপর্যয় রোখার জন্য একটি
কমিটি তৈরি করা হয়েছিল।(কেন্দ্রে ও প্রত্যেকটা রাজ্যে নিজেদের মতন করে)তার
দায়িত্বে ছিলেন বিশিষ্ট এক সচিব।Swine Flu এর সময় এই
কমিটির কার্যকলাপ ‘হু’এর ও প্রশংসা কুড়িয়েছিল।যদিও করোনা ভাইরাস H5N1 flu
virus এর চেয়ে কমপক্ষে ১০ গুন বেশি বিধ্বংসী,কিন্তু এই সঙ্কটকালে
সেই কমিটিকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছেনা।অবশ্য যে দেশে স্বাস্থ্য খাতে ১% এরও কম অর্থ
ব্যয় করা হয়ে থাকে, সেখানে এ হেন কমিটিকে জিইয়ে রাখার চাইতে কোটি কোটি টাকা খরচ
করে মূর্তি বানানো অনেক বেশি সহজ কাজ নয় কি??পশ্চিমবঙ্গে এইহেতু নামজাদা
বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি কমিটি বানানো হয়েছে বটে,কিন্তু শুধুমাত্র ভিডিও কলে উপদেশ
দিয়ে অবস্থা কাছ থেকে গভীর ভাবে পর্যবেক্ষণ না করেই তাঁরা কিভাবে উপায় বাতলাবেন তা
নিয়েও সন্দেহের অবকাশ রয়েই যায়। “ টাকা ছাপিয়ে’’ সেই টাকা গরীবদের দিয়ে দেওয়াটা
বলা যতটা সহজ মনে হয়, করে দেখানোটা ততটাই কঠিন, তবে অসম্ভব কিছু নয়। এ ক্ষেত্রে
টাকার দাম পড়ে যেতে পারে বলে চিন্তা আসাটা স্বাভাবিক কিন্তু যে দেশের জিডিপি
তলানিতে এসে থেকেছে, বেকারত্ব আকাশচুম্বী,নোটবন্দির ক্ষত এখনও দগদগে,সেক্ষেত্রে
বিলো দ্য দা পোভার্টি লেভেল এর মানুষ এর কাছে কিছু টাকা পৌঁছে দেওয়া এখন এইসময়ে
ভীষণ ভাবে প্রয়োজন,নইলে তাঁরা রাস্তা নেমে দু মুঠো ভাতের জন্য ভয়ঙ্কর কোনও পদক্ষেপ
নিতে বাধ্য হতেই পারে। পায়ে হেঁটে কয়েকশো কিমি. পথ পাড়ি দিয়ে ক্লান্ত মজদুরদের
মিছিল থেকে আজ উঠে আসছে হাহাকার,কাল তা আগ্রাসী রূপ নিতেই পারে, তখন যদি তাঁরা বলে
বসে “হারামজাদা ভাত দে,নইলে মানচিত্র খাব” তখন কি করবেন রাষ্ট্রনেতারা?”রেশন মজুত
আছে “ এই আশ্বাস কতদিন দিতে পারবেন,যতদিন আমাদের চাষিভায়েরা এই দুঃসহ অবস্থাতেও
জমিতে কাজ করে চলেছেন।এখন রবিফসল কাটার মরশুম,তাই কৃষিতে লকডাউন হয়নি,সঙ্ক্রমন এ
থেকে ছড়াবেনা এমন কোনও গ্যারান্টি আছে? তাও “ওরা মাঠে মাঠে বীজ বোনে,পাকা ধান
কাটে” কাদের জন্য?প্রতিশ্রুতি যারা দেওয়ার তাঁরা দেন।অথচ তা রাখার দায়িত্ব “ওদের”
উপরেই বর্তায় অনেকাংশে।
ওদিকে ঢাক পেটানো কিন্তু অব্যাহত আছে। আই
টি সেল তার কাজে যে কর্মনিপুণ। মনগড়া পরিসংখ্যান দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া হচ্ছে ‘জন ধন
যোজনা’য় উপকৃত হয়েছে বিশাল সংখ্যক মানুষ। বহু কিষান এর অ্যাকাউন্টে টাকা পৌঁছে
যাচ্ছে, নেপথ্যে সেই অর্থমন্ত্রী কর্তৃক ঘোষিত “ বিশেষ প্যাকেজ”। কিন্তু সচেতন
মানুষ এই কারসাজিটা ধরে ফেলেছেন। পূর্ব প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ৩য় কিস্তির টাকা ঢোকার
কথাই ছিল এপ্রিলে,করোনা উপলক্ষ্যে আগাম দেওয়া হয়েছে মাত্র। এই দুঃসময়েও মানুষকে
বোকা বানানোর প্রকিয়া বহাল আছে।১৩০ কোটির দেশে ৫৬% মানুষ কৃষিকাজের সাথে যুক্ত,
সেখানে ঠিক কজন এর এই অ্যাকাউন্ট আছে?‘বিরোধীরা করতে দেয়নি“ এই দুয়ো তুলে পার পেয়ে
যেতে পারেন তবে ৭ কোটি প্রাপককে ১৭ কোটি বানানো যে আপনাদের ‘বাঁয়ে হাত কা খেল” সে
আদ্দিনে সবাই জেনে গেছে। আর সরকার এর হয়ে মানুষকে জানানোর জন্য কিছু শিরদাঁড়াহীন
সাংবাদিকরা তো আছেনই !”Nation wants to know” এবার
সত্যিই তারা জানতে চায় তাঁদের ভবিষ্যত কোন অন্ধ কুঠুরিতে নির্বাসিত হয়ে আছে। দাঁড়ান,
তার আগে ধর্মীয় রাজনীতি নিয়ে একটু না উস্কালে কি এনাদের পেটের ভাত হজম হয়?করোনা
মিছিল আরম্ভ হয়ে গেলেও তখনও লকডাউন কার্যকর হয়নি।নিজামুদ্দিনে কয়েকদিনব্যাপি জমায়েত
হওয়াটা আটকানোর ব্যাপারে দিল্লি সরকারেরও বিশেষ মাথা ব্যাথা ছিলনা,আর কেন্দ্র তখন
মধ্যপ্রদেশের সরকার ভাঙ্গা গড়ার খেলায় মত্ত। ফলতঃ তবলিঘি জমায়েতে আসা বিদেশিদের
থেকে বহু মানুষের মধ্যে রোগ ছড়িয়ে পড়ে। আর সেটাকে নিয়ে “আমরা ওরা” বিভেদ করার
সুবর্ণ সুযোগ ছাড়েননি গেরুয়া বাহিনী,অথচ ওদিকে যে গোমূত্র পান করার জন্য মানুষের
ভিড় লেগে গিয়েছিল,রামলালার বিগ্রহ স্থাপন করা হচ্ছিল মহা সমারোহে সেখানেও কি ১ হাত
ব্যবধান রেখে মানুষ একত্রিত হয়েছিলেন?রাহুল গান্ধীর সতর্ক টুইটবানী নিয়ে তখন
একপ্রস্থ হাসি ঠাট্টাও চলেছিল বরাবরের ন্যায়।
বিজ্ঞানকে ফুঁৎকারে উড়ানোর অভিযোগ বরাবরই
ভারতবাসীর “ জাতীয় অধিকার’ এর মধ্যে পড়ে থাকে,বর্তমানে তার দৌরাত্ম্য বেড়েছে আরও।
করোনার ক্ষেত্রেও সেকথা প্রযোজ্য। ৯ই এপ্রিল ৯ মিনিটে বাতি জ্বালালে নাকি চুম্বক
ক্ষেত্র তৈরি হয় যাতে ভাইরাস ভিরমি খায় কিম্বা ঘণ্টার শব্দে ভাইরাস এর কানে তালা
লেগে যায় ইত্যাদি আজগুবি গুজব যে পাবলিক ভালো খায় সে “ বিগ বস”এর সাঙ্গপাঙ্গরা
ভালই জানেন,তাই তার দেওয়া টাস্ক পালনের বাড়াবাড়ি রকম ধুম পড়ে গিয়েছিল স্বাভাবিক
ভাবেই,তাও আবার যা বলা হয়েছে তার সাথে নিজেদের ক্রিয়েটিভিটির মিশেল ঘটিয়ে। ঘরবন্দি মানুষকে একতাবদ্ধ
ভাবে লড়াই করার উৎসাহ জোগানো এবং ’তাঁদের’
বাহবা দেওয়া যারা আমাদের বাঁচাতে রাত দিন এক করে দিচ্ছেন,বিভিন্ন
প্রতিকূলতার কাছে হার না মেনে অক্লান্ত পরিশ্রম করে চলেছেন( যার জন্য তাঁদের
মানুষের হাতে প্রহৃতও হতে হয়েছে বিভিন্ন জায়গায় বারংবার, হ্যাঁ এন আর এস কাণ্ডের
পরেও এসব হয় বই কি!)~ এই দুই উপলক্ষ্য কে সামনে রেখে নিজের “ক্যারিশ্মা” যাচাই এর
এটাই তো সেরা সময়,আরও একবার আমরা প্রমাণ পেলাম!!
লকডাউন আরও এগোনো যেতে পারত / আন্তর্জাতিক
বিমানগুলোর অবতরণ বহু পূর্বে স্থগিত করা যেতে পারত~ এইসকল সম্ভাব্য পরিস্থিতিগুলি
নিয়ে পর্যালোচনা চলতেই পারে তবে দৃঢ়ভাবে এই সিধান্ত নেওয়া যেকোন রাষ্ট্রনেতার
পক্ষেই কঠিন তা অনুমেয় কারণ তাকে এইসব পদক্ষেপের পরবর্তী অবস্থার কথাও ভাবতে হয়।
ভারতের তথা সারা বিশ্বের পর্যটন শিল্পেই করোনা বসিয়েছে তার করাল থাবা। অর্থনৈতিক
মন্দা অবশ্যম্ভাবী,কিন্তু সবার আগে তো মানুষের প্রাণ এই নিয়ে দ্বিধা দ্বন্দেও
কিছুটা সময় অতিক্রান্ত হয়েছিল। “কি হলে কি হতে পারতও” এর চেয়ে এখন বেশি জরুরি কি
করা দরকার। হটস্পটগুলো চিহ্নিত করে সেখানে কড়াকড়ি লকডাউন কার্যকরী করাটাই বড়
চ্যালেঞ্জ। মুদিখানা,ওষুধের দোকান এর পাশাপাশি ফুলের বাজার,মিষ্টির দোকান ইত্যাদি
খুলে রাখা হয়েছে পশ্চিমবঙ্গে,ছোট ও মাঝারি ব্যাবসায়ীদের কথা মাথায় রেখেই...তবে
কিষান মান্ডি থেকে করোনা সংক্রমণ রোখার জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা কি আছে বাংলায়? ঘটি
করে সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার বা মুখে গামছা বাঁধার নিদেন দেওয়া হলেও সেটা কতটা
ফলপ্রসূ হবে তা নিয়ে সংশয় আছে।ঘরবন্দি থাকতে বিভিন্ন মাধ্যম থেকে প্রচার চালানো হচ্ছে,কিন্তু যাদের মাথার
উপরের চাল টুকুও নেই সেই সকল ফুটপাথবাসীকেই বা কিভাবে এই মহামারির কবল থেকে রক্ষা
করা যাবে? মুম্বাই এর ধারাভি বস্তি থেকে তাই সংক্রমণ ছড়াচ্ছে মহারাষ্ট্রের এ
প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে।
যে হাইড্রক্সিক্লোরোকুইনকে করোনার মহৌষধ
বলে দাবি করে “পরম মিত্রোঁয়ো” ট্রাম্প হুঙ্কার ছেড়েছিলেন ভারত তাদের সরবরাহ না
করলে “দেখে নেবেন”,এবং ভারত ‘ নিজের জন্য যথেষ্ট মজুতি রেখেই” সেই ওষুধ উড়ান মারফত
পৌঁছে দিতে কার্যত বাধ্য হয় মার্কিন মুলুকে,এখন সমীক্ষা বলছে যে ‘ম্যালেরিয়া আর
রিউম্যাটয়েড আর্থ্রাইটিস”এর জন্য বহুল ব্যবহৃত HDQ আদপে ততোটাও কর্মক্ষম নয় বরং দেখা গেছে এটা প্রয়োগের ফলে অনেকের
শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা বৃদ্ধি পায় । ‘হু’ ১৫ বছরের কম বয়েসিদের জন্য এর প্রয়োগে
নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে এবং ডাক্তারের পরামর্শেই এর সেবন করা উচিত বলে মতপ্রকাশ
করেছে। এখন প্রশ্ন ওঠে এত হুড়োহুড়ি করে কেন আমেরিকা চেয়ে পাঠাল?সামনে ভোট বলে সে
দেশে ট্রাম্পজি যা প্রানে চাইছে বলে যাচ্ছেন আর করে যাচ্ছেন। বিভ্রান্ত নাবিকের
মতন দিক ঠিক করতে পারছেন না তিনি। ভারতে যদিও সেই অবস্থা এখনও আসেনি তবে বলতেই হয়
দেশনেতাদের অনেকেই এখন পারস্পরিক বিদ্বেষ ভুলে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন একযোগে “করোনাসুর”
নিধন যজ্ঞে( কাদা ছোঁড়াছুড়ি একেবারেই বন্ধ তা নয় মোটেই তবে আগের তুলনায় কম)। অভিযোগের
আঙ্গুল অনেকেই তুলেছেন “নমস্তে ট্রাম্প” এর দিকে। ঐ লোকদেখানো অনুষ্ঠানের গুরুত্ব
নিয়ে,সেইসময়ে সতর্ক হয়ে যাওয়া নিয়ে...কিন্তু বিশ্ব কূটনৈতিক মঞ্চে ভারতকে চিন আর
পাকিস্থান থেকে গার্ড করতে আমেরিকাই যে ঢাল সে কথা ভুললে চলবে কেন?অগত্যা বড়দার
হুমকিতে ৫৬ ইঞ্চির ছাতি ওয়ালা ভাই দমে যাননি মোটেই,দাদার হাত মাথা থেকে সরে গেলে
যে আরেক বিপদ সে তিনি বিলক্ষণ জানেন বই কি !
কোনও কর্মসূচি গ্রহণ করার আগে সে বিষয়ে
সম্যক ধারনা থাকা বাধ্যতামূলক। কথা হচ্ছে বেশিরভাগ নেতা মন্ত্রীরাই এই বৃত্তের
বাইরে পরেন।ফলতঃ কোনও কিছু একটা ঘোষণা করে দিয়েই খালাস হয়ে যান তারা,তার
সুদূরপ্রসারী প্রভাব নিয়ে ভাবনা চিন্তা করেননা। উদাহরণ হিসেবে বলি,স্কুল বন্ধ
থাকায় অন্যান্য রাজ্যের দেখাদেখি আমাদের বাংলায় অনলাইনে শিক্ষাচর্চা করতে হবে এই
মর্মে “বাংলা শিক্ষা পোর্টাল” এর হদিশ বাতলে দেওয়া হয়,এমন কি দূরদর্শনে ক্লাস হবে
নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণির সেটা ঘোষণা করেন স্বয়ং শিক্ষামন্ত্রী।এ নিয়ে বিস্তর
মতবিরোধ দেখা দেয়।প্রথমত, দূরদর্শন এর দর্শকসংখ্যা বড়ই কম,দ্বিতীয়ত, ঐ অনলাইন
পোর্টাল এখনও ছাত্রছাত্রীদের access করার অবস্থায়
নেই,স্কুলই একমাত্র পারতো এই সাইটে ঢুকে রেসাল্ট বা অন্যান্য জরুরি তথ্য এন্টার
করতে(কারন এটা সম্পূর্ণ ভাবে তৈরি হওয়ার কথা ছিল এ বছরের মাঝামাঝি ), তৃতীয়ত,
শহরের মানুষের কাছে স্মার্টফোন বা ইন্টারনেট যতটা সহজলভ্য গ্রামাঞ্চলে তা নয়। দিন
মজুরের ছেলে, একজন ফার্স্ট জেনারেশন লার্নারের কাছে জুম অ্যাপে ভিডিও কনফারেন্সিং
এ ক্লাস করা আর বামনের চাঁদ ধরা সমগোত্রীয়। অতএব পরেরদিনই তড়িঘড়ি করে পূর্ব ঘোষণা
বাতিল করে পরে একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলের মাধ্যমে ক্লাস শুরু হল। অবশ্য একাদশ
দ্বাদশের পরীক্ষা বন্ধ,বাংলা ইংরেজি আগেই হয়ে গেছে সেক্ষেত্রে ১২ এর বাংলা ক্লাস
(যে ক্লাসে এখন কোনও ছাত্রই নেই,একাদশ এর ছাত্র ছাত্রীদের পাশ করানোর ঘোষণা তখনও
হয়নি) করার অর্থ কি?বোর্ড যদিও সিবিএসসি আর আইসিএসসি এর পদাঙ্ক অনুসরণ করে ২০২০-২১
শিক্ষাবর্ষে ১ম থেকে ৮ম শ্রেণীর সকলকেই পরের ক্লাসে পাশ করিয়ে দেওয়ার নির্দেশ
দিয়েছে তবুও এ প্রশ্ন রয়েই যায় যেসব বিষয়ের পরীক্ষা অলরেডি হয়ে গিয়েছে সেগুলোর
ক্লাস কেন নেওয়া হচ্ছে?”জোড়াতালি দিয়ে কিছু একটা করেছি” এই বাসনা ত্যাগ করাই শ্রেয়
আপাতত। শুধুমাত্র স্কুল নয়,কলেজে ও বিশ্ববিদ্যালয়েও অনলাইনে সম্পূর্ণ পঠনপাঠন চালানোর
মত সুপরিকল্পিত পরিকাঠামো আমাদের “ডিজিটাল ইন্ডিয়া”য় নেই! “ওয়ার্ক ফ্রম হোম” এর
সুবিধা নেই যেমন সমস্ত কর্মক্ষেত্রে ঠিক তেমনি।
করোনা এসে আমাদের ঠারে ঠারে বুঝিয়ে দিল
অনেক কিছু,চোখে আঙ্গুল ধরিয়ে দিল আমাদের খামতিগুলো। একতাবদ্ধ হতে শেখাল, বৈষম্য
ভুলে গিয়ে। আমরা কি শিখতে পারলাম?নাকি এই ঝড় থেমে গেলে আবার আমরা সেই ‘স্বার্থপর দৈত্য’ বনে যাব? সেটা সময় বলবে...।