~*অন্য রকম ভালো*~
‘’ আরনাভ , তুই দিওতিমাকে ভালবাসিস?” পিয়াল ওর চশমাটা মুছতে মুছতে
এমন ভাবে আমাকে প্রশ্নটা করল যেন আমি
ভাত এর সাথে কি খেয়ে স্কুলে এসেছি তাই জানতে চাইছে !
একটু হকচকিয়ে গিয়ে আমি বলে উঠলাম। ‘’ এ কথা তোকে কে বলেছে রে
?”
পিয়াল চশমাটা চোখে পরে আমার দিকে একদৃষ্টে
তাকিয়ে বলল ,’’ এসব কথা জনে জনে বলার দরকার পড়েনা ভাই
!! মেয়েরা সব বোঝে ! বল বাসিস কিনা ?”
মেয়েদের এই সুপার পাওয়ার সম্পর্কে আমার ভীষণ
আপত্তি আছে ।
সব
জানে মানে টা কি ? ছেলেরা কি ঘাসে মুখ দিয়ে
চলে নাকি?? কিন্তু পিয়াল যা মেয়ে ওর সামনে এসব কথা বলা মানে বলির
পাঁঠা হওয়া ।
আমি বায়োলজি ল্যাব এর দিকে তাকিয়ে বললাম,
‘’না তেমন কিছু না ! বেশি ভাবিস তোরা !”
‘’তোরা মানে টা কি হ্যাঁ?? জেনারালাইজড
করছিস তুই মেয়েদের?যা জিজ্ঞেস করলাম তার উত্তর যদি হ্যাঁ বা না এ দিতে পারিস দিবি
নইলে ফুটে যা আমার সামনে থেকে !!”
যা শালা,ওই তো আগে বলল মেয়েরা সব বোঝে তার
বেলা কিছু না?আর পিয়ালই তো এসে ধপ করে আমার পাশে বসে পড়ল।তাও আমি উঠে যাব? কি
জ্বালাতন! টিফিন শেষের ঘণ্টাটা আজ প্রথমবার আমার সাথে সাথ দিল,তাই শুধু আমি না
সবাইকেই মাঠ ছেড়ে ক্লাস এ যেতে হল ।
দিওতিমা আমাদের সাথে ক্লাস এলেভেন থেকে
এসে পড়ছে । ওর বাবার ট্রান্সফেরাবেল জব তাই এইচ এস টাও ও আমাদের এই স্কুল থেকেই
দেবে বলে পলুর খবর ! আমার জিগরি দোস্ত পলু ওরফে প্লাবন ! স্কুল এর সব ছাত্রীর
বায়ডাটা ওর নখদর্পণে । কিন্তু বেচারার কপালটাই খারাপ,ওর যাকেই ভালো লাগে সে আবার
অন্য কারুর জন্য মন প্রাণ সমর্পণ করে বসে থাকে । তাই ও শুধু খবর দিয়েই বেরায় নিজে
আর খবর হয়ে হেডলাইন এ আসতে পারেনা !
দিওতিমা কে দেখে আমাদের ছেলেদের মনে যে
ঢেউ জেগেছিল সেটা কেউ মুখে স্বীকার নাও করতে পারে কিন্তু মনে মনে অবশ্যই করবে
!(আমিও পুরুষ ,ব্যতিক্রম নই!) ডাগর চোখ,মাথা ভরা কোঁকড়া চুল , ফর্সা গাল, টিকালো
নাক আর ফিগার টা পুরো ওই...থাক থাক বুকের
বাঁ দিকে ব্যথা দিতে চাইনি আমি...মাইরি বলছি মোটকথা সে সুন্দরী আর বুদ্ধিমতী নারী
আর এমন নায়িকা গোত্রীয় মেয়েদের জন্য যে ছেলেরা রেললাইন এ ইট পাতবে সেটা আর আলাদা
করে বলার অপেক্ষা রাখেনা ! ফলত স্কুল জুড়ে হুড়োহুড়ি পরে গেলো, পলুর গোপন সূত্রের
খবর যে ২ মাসে ১২ জন ছেলে ওকে প্রপোস করেছে ,তার মধ্যে পলু স্বয়ং আছে,এমন কি
টুয়েলভের দাদা থেকে শুরু করে ক্লাস ৯ র ‘বাচ্চা’ ছেলেও আছে । এসব শুনে টুনে আমি
ভাবলুম আমি কোন মুই কি হুনু যে আমায় সে পাত্তা দেবে, ওরডিনারী ছেলে আমি। বাবা
কারখানায় কাজ করে অনেক কষ্ট এ পয়সা রোজগার
করে আমাকে সায়েন্স পড়াচ্ছে যাতে জয়েন্ট দিয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ এ চান্স পেতে পারি
,এসব ইনফ্যাটুয়েশন বই তো নয় তাই মনের কথা মনে চেপে রেখেই প্রাণপণে এসএন দের অঙ্কগুলো
করে যাচ্ছিলাম । কিন্তু পিয়াল মেয়েটার জন্য যে গোল বাঁধতে চলেছে তা আগে আঁচ করতে
পারিনি। দিওতিমা
এমনি তে ভীষণ চুপচাপ , সিরিয়াস মেয়ে। পিয়াল এর সাথে যে কি করে ওর গলায় গলায় ভাব হল
তার কিনারা আমি আজও করতে পারিনি । পিয়াল আর আমি সেই নার্সারি থেকে একসাথে পড়ছি ।
বিশ্ব বখাটে বলতে যা বোঝায় ও তাই । মাঝে মাঝে আমারই সন্দেহ হয় ও ছেলে না মেয়ে ! এ
কথা জিজ্ঞেস করলেই চিত্তির, ও যাকে খুশি
দুমদাম মেরে দেয় । আর সুন্দরী মেয়ে দের ১ টা মস্ত বড় সুবিধা হল তারা শত শত অপকম্ম
করেও ছাড় পেয়ে যায় । পলু যে ওর প্রতি দুর্বল সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ওযে কতো বার
টিচার দের হাত থেকে পার পেয়ে গেছে তার ইয়ত্তা নেই (পলু বোধহয় পৃথিবীর সবচেয়ে দুখী
মানুষ,বেচারার জন্য আমারই খারাপ লাগে ) ।
যাই হোক পিয়াল আমারও ‘ভালো’ বন্ধু, তাই
আমার মনের কথা ওর জানাটা খুব অসম্ভব কিছু না কিন্তু তা বলে এসব ভালবাসি কিনা জাতীয়
‘মেয়েলি’ প্রশ্ন যে শেষকালে ও আমায় করবে অন্যের হয়ে আমি দুঃস্বপ্নেও ভাবিনি কারণ
যে মেয়ে বিকেল হলেই ছেলেদের সাথে পাল্লা দিয়ে ক্রিকেট খেলে হট প্যান্ট আর হাত কাটা
গেঞ্জি পরে (পলু কাকে ভালবাসে জানিনা ওকে না ওর শেভ করা পা দুটোকে...মালটা এত
ঠোঁটকাটা আমাকে বলেছে এসব নাকি ও ভাবে রাত্তিরবেলা শুয়ে শুয়ে!!) আর বয়েস কাট চুল
কেটে সাইকেল নিয়ে এ পাড়া সে পাড়া চক্কর কেটে বেরায় তার মুখে এসব কথা খানিকটা আজগুবিই
লাগে বৈকি ! পিয়াল একবার আমার সাথে স্কুল এর পিছনের
বাগানে গিয়ে যেখানে আমরা ছেলেরা বসে একসাথে ‘টুকটাক কিছু খাই
টাই’ সেখানে গিয়ে হামলা করেছিল । ওর
দাবি ওকে নাকি শেখাতে হবে কি করে সিগারেট এর বড় বড় রিং ছাড়তে হয় । যাই
হোক ওর এসব পাগলামি এনজয় করি মাঝে মাঝে তবে ব্যক্তিগত পরিসরে ওর অনধিকার প্রবেশ
~মানছি না মানব না! কিন্তু ওই বদমাশ মেয়েটা গঁদ
এর আঠার মতন চিপকে রইল আমার সাথে পরপর তিন দিন । হরধনু
ভাঙ্গার মত ও যেন পণ করেছে দিওতিমার সাথে আমার সেট করিয়ে তবেই ও ছাড়বে । কিন্তু
এসব অল্প বয়েসে প্রেম ফেম করাটা হেভি চাপ এর ব্যাপার
! নিজের নেই চাল চুলোর ঠিক। ওরম
ডল পুতুল টাইপ এর মেয়েকে আমাদের ঘরের ভাঙ্গা কাঁচের শো কেসেও মানাবেনা
! তাই এসব কেস এ ফাঁসলে এক দুই দিন হয়তো ভালো লাগবে তারপরে পেছনে যে
বাঁশ পড়বে তা সদ্যজাত শিশুও জানে !( দেওয়ার লোকের অভাব আছে নাকি পৃথিবী তে?)
যেখানে বাঘের ভয় সেখানেই সন্ধ্যে হয় ।
অঙ্কটা ভালো পারি বলে দিওতিমা আমার কাছে অঙ্ক বুঝে নিতে আসতো ! ‘ পিয়ার লার্নিং’
ভালো জিনিস শুনেছিলুম কিন্তু ‘ প্যায়ার লার্নিং’ যে কি কষ্টের জিনিস কি আর বলব ! ও
ভালো কোচিং এ পড়ত মেডিকেল এ বসার জন্য তাই ‘অঙ্ক কি কঠিন’ লাগাটাই ন্যাচারাল
কিন্তু ভালো লাগার মানুষকে অঙ্ক বোঝাতে গিয়ে আমার কেস টাই টাই ফিস হয়ে যাচ্ছিল ।
ক্যালকুলাস গুলো মাঝে মাঝে এমন না ইন্সাফি করত আমার সাথে যে দিওতিমার সামনে বসে
আমার পেনের মাথাটা ঝাঁটায় পরিণত হত (মেটামরফোসিস)!!
“ কি আরনাভ , অঙ্কটা খুব টাফ না? আমি কাল
কত্ত চেষ্টা করলাম হলই না! তুই পারবি আমি সেন্ট পারসেন্ট শিওর !” কি ছিল ওর ওই
মিষ্টি রিনরিনে গলায়, আশ্বাস ভরসা?(তু তো গ্যায়া আরনাভ!এত ভাবা ভালো নয়) আমি অঙ্ক
নিয়ে বাড়ি চলে গেলাম,পাক্কা দুই ঘণ্টা তার সাথে কুস্তি কুংফু খেলে, প্যাঁচে কাত করে পরের
দিন যখন ওর হাতে সেই পরিশ্রম এর ফসল তুলে দিলাম, ওর ‘থ্যাংক ইয়ু’’ শোনার পর মনে হল এই জন্যেই আমি বেঁচে আছি,
ওর হাসিটাই আমার জলপাই পাতার মুকুট। এমন
রোমান্তিক চিন্তায় বাগড়া দেওয়ার জন্য পলু মাটি ফুঁড়ে উদয় হল।
“ কি গুরু? সিঙ্কিং
সিঙ্কিং ড্রিঙ্কিং ওয়াটার ?” বলেই দাঁত কেলিয়ে এমন ভাবে হাসল
যেন ও জানতে পেরেছে সালমন খান কবে বিয়ে করছে !
“ দেখ বাজে বকলে তোর ওই বদন এর জিওগ্রাফি
খানা চেঞ্জ করে দেব ।
মেয়েটা
অঙ্ক করতে দেয় আমায় পারেনা বলে ব্যাস…বন্ধুই তো
বন্ধুর জন্য করে তাই না?” আমি নিজের স্বপক্ষ এ যুক্তি দিলাম ।
“শুধুই বন্ধু?কই ভাই আমি সেদিন তোকে বললাম জিপি এর কয়েকটা সামস পারছিনা
তুই আজ করব ,কাল দেব বলে ঝোলালি ? আমি তোর কেউ না?” পলু সেন্টু হয়ে বলল ।
“ দেখ তুই আর ও এক হলি? তুই অঙ্ক এর বই এর
মোট কটা চ্যাপ্টার তাই জানিস না,সাত জন্মে বিপি স্যার এর টিউশন এর রাস্তা মাড়াস
না...অঙ্ক করে দিলেও বুঝতে পারবিনা তাই করে দিয়নি।সামঝা?‘’ মারমুখী গলায় বলে উঠলুম
।
পলু হালে পানি না পেয়ে পাঁচন গেলা মুখ করে
যেই পেছন ফিরতে যাবে অমনি আরেক মূর্তির উদয় ! পিয়াল ! পলু ফ্রিজ শট এ দাঁড়িয়ে পড়লো
! পিয়াল ওকে দেখেও না দেখার ভাণ করে গট গটিয়ে আমার সামনে এসে ঘাড় কাত করে এসে
বলল,” আজ যাবি ফিজিক্স পড়তে ?”
“ হ্যাঁ যাবো,কেন ?” একটু অবাক হয়েই বললাম
কারণ পিয়াল আর পড়াশোনার মধ্যে সম্পর্ক নর্থ পোল আর সাউথ পোল এর !
“ ঠিক আছে। ছেলেদের ব্যাচ শুরু হয় সাড়ে
ছ’টায় আর আমাদের শেষ হয় পৌনে ছ’টা নাগাদ ! তোর সাথে কিছু বাতচিত আছে,একটু তাড়াতাড়ি
আসিস !” বলেই যেমন ঝড়ের মতন এসেছিলো তেমন ভাবে বেরিয়ে গেলো ও।পলু কি বুঝল ঐ জানে
গোমড়া মুখে চলে গেল ।
দূর...কিছুদিন ধরে সবাই এমন হেঁয়ালি করে
কথা বলছে কেন আমার সাথে বুঝতে পারছি না!
মা সেদিন ভাত বাড়তে বাড়তে বলল , “ দেখ
বাবু, এই বয়েসটা খুব জটিল। ভালো লাগার বয়েস । তুই এসব এ জড়াস না । মেয়েদের থেকে
দূরে থাকিস , কখন কি হয় বলা যায়না । আর ঐ ছেলে ছেলে মেয়েটা,কি যেন নাম... হাঁ ......
পিয়াল ওকে তো আমার একদম ভালো লাগেনা,কেমন যেন একটা ।ওর সাথে বেশী কথা বলার দরকার
নেই !
মা এরম লক্ষণ রেখা কেটে দেওয়ার পর আমি আরও
গুটিয়ে গেছিলাম । কিন্তু বাঙালী হল গিয়ে কবির জাত ! মনের কথা পরাণের কথা ‘পোদ’দে
(এসব ভাষা আমার না ,পলুর!আমি ‘ভালো ছেলে’) প্রকাশ পেতে লাগলো !
‘’ ও দিওতিমা,করিয়ো ক্ষমা / মনের কথা
হচ্ছে জমা...।।“ এই টাইপের লেখা আর কি!
গত
পরশু কিছু নোটস নিতে এসে আমার বাড়ী এসেছিল প্লাবন !( আমার বাড়ী ওর সেকেনড হোম )
তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে আমি সেইসব গুপ্তধন লুকাবার কথা ভুলেই গেছি বেমালুম । ফলত যা হয় আর কি, আমাকে চাটার সুযোগ
কেউ মিস করে নাকি? মা ওর অট্টহাসি শুনে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসেছিলো । কোনোরকমে
ওকে তাড়িয়ে হাঁফ ছেড়ে বাঁচি । বাবা যদি জানে কোনক্রমে যে ছেলে দিওয়াণা হয়ে কাব্য
করছে পেঁদিয়ে পাঁপড়িচাট বানিয়ে দেবে ! আমার দিদি প্রেম করে পালিয়ে গিয়ে ঘর ছেড়েছিল
বলে আজ অবধি বাবা মা ওর মুখদর্শন করেনি । দিদির কথা ভীষণ মনে পড়ে আজকাল কিন্তু
যোগাযোগ করার উপায় নেই । আমার ফোন ও নেই আর ওর নতুন ফোন নাম্বার ও আমার কাছে নেই ।
জানি ও থাকে কোথায় কিন্তু বাবা মা আমায় ঐ ঘটনার পর থেকে এমন ভাবে বেঁধে রেখেছে যে
এলাকার বাইরে যাওয়ার কথা ভাবলেও গায়ে জ্বর আসে ! বাবা সদ্য বিবাহিতা দিদি কে আমার
পলিটিক্স করা ‘বেকার’ জামাইবাবুর সামনে কেমন মার মেরেছিল তা ছয় বছর পরেও আমার মনে
আছে । আমার কোন কাজ এর জন্য বাবা মা অপমানিত হোক আমি কোন ভাবে চাইনা তাই নিজের ওপর
কীভাবে কন্ট্রোল রাখতে হয়, অভাবের সংসারে কীভাবে মানিয়ে নিয়ে চলতে হয় সব কিছুই খুব
অল্প বয়েস থেকেই আয়ত্ত করে নিয়েছি । নিয়ম এর বাইরে গিয়ে কাজ করার কথা ভাবিইনি
কোনোদিনও । কিন্তু মন আর হরমোন এই দুই ভয়ানক বস্তু তাই সকাল বিকেল রাতে দিওতিমার
মুখ ছাড়া আজকাল কিছুই ভাসছেনা । আমার এক বন্ধু রাঘব সেদিন আমায় বলছিল ,” কি তুই
দিনরাত ঐ মেয়েটার অংক করে দিস বলতো ? ও তোকে ইউজ করছে বুঝতে পারছিস না বুঝতে
চাইছিস না ? “ হয়তো ওর দ্বিতীয় অপশণ টাই ঠিক কিন্তু প্রেম নামক মারণ গেমে মানুষ
একবার পড়লে আর উঠে দাঁড়াতে পারেনা ! সব কথা সব সময় বন্ধুদের সাথেও শেয়ার করা যায়ণা
। নিজের আওকাদ বুঝি বলেই আড়াল করে রাখি নিজেকে ।
জয়ব্রত স্যর এর কাছে আমি আর পলু একসাথে পড়তে
যাই ফিজিক্স ।আজ আবার পিয়াল আগে ভাগে আসতে বলেছে । আমি সাইকেলটা গলির মুখে দাঁড়
করিয়ে অপেক্ষা করতে থাকলাম । পলুটা ইদানীং খুব সিগারেট খাচ্ছে । ফাঁক পেলেই ফুকতে
চলে যায় । অবশ্য আজ মেয়েদের লাইন মারার জন্য ও বোধ হয় ‘ একটু ঘুরে আসি “ বলে দূরে
চলে গেল। আমাদের ব্যাচ এর সব ছেলেই লেট লতিফ টাইপের । এত আগে কেউ আসেনি আমরা দুজন
ছাড়া (আমরাও আসিনা !) মেয়েরা সব কলকল করতে চলে গেল । কিন্তু পিয়াল কই ? আমি এদিক
সেদিক খুঁজছি ওকে । আর আমি এটাও ঠিক বুঝলাম না যে কি এমন কথা ও বলবে যে স্কুল এ না
বলে এখানে একান্তে এসে বলতে চাইল ! আমার
সিকসথ সেন্স বলছে কিছু একটা ঘটতে চলেছে !
এসব আনতাবরি ভাবছি এমন সময় সামনে চেয়ে
দেখি দিওতিমা আসছে আমার দিকে ! ও যে এখানে পড়ে জানা ছিলনা । ওকে দেখে আমি ক্যাবলার
মতন হাসলাম। নীল রঙ এর কুর্তিতে ওকে ঠিক
ওই রূপকথার নীল পরির মতন লাগছে । ও আমার কাছে এসে থেমে গেল হঠাৎ ।
“ আরনাভ তোর সাথে আমার কিছু কথা আছে! ভালই
হল দেখা হয়ে গেল ।“
“আ আমার সাথে কথা? কোনও সামসে
অসুবিধা...?”
“পড়াশোনা র কথা নয়। তোকে যতটা বোকা ভাবতাম
ততটা তুই নোস!”বলে ও থামল ।
আমার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ল। আমি বোকা
সাজি মানেটা কি? এটা কি ধরনের অপমান?
ভাবলাম ওকে জোর গলায় বলি “ কি বলতে চাস
বে?” কিন্তু ওর রাগী রাগী মুখ টা দেখে গলার স্বর ছাগল ছানার মতন হয়ে বেরোল ,” মা
মা মানে?”
“এটা
কি ?” বলে ও আমার মুখ এর সামনে ওর দামি ফোন টা তুলে ধরল ।
আরে এগুলো তো আমার সেই লেখা কবিতা গুলোর
ছবি ? কে পাঠিয়েছে ! আননোন নাম্বার থেকে, হোয়াটস অ্যাপে...! আমার মন বলছে এ পলু
শয়তান টার কাজ কিন্তু দিওতিমা কি রেগে গেছে? নিশ্চয়ই রেগেছে কি করি এবার ...যাহ্...।।!!
“দেখ আমার ফোন নেই, আমি তোকে ওগুলো পাঠাই
নি। “ গলায় সাহস সঞ্চয় করে বললাম।
“কবিতা গুলো তোর লেখা কিনা সেটা জানতে চাইছি
আমি,তোর হাতের লেখা আমি চিনি সত্যি বল তোর কিনা ?” ওর গলাটা পাকা গোয়েন্দাদের মতন
শোনাচ্ছে !
ধরা পড়া চোরের মত আমি মাথা নিচু করে হ্যাঁ
বলার পর শুনতে পেলাম সেই মিষ্টি রিনরিনে গলায় হাসির আওয়াজ ।
‘’ তুই আমাকে বনলতা সেন বানিয়ে ছেড়ে দিলি
তো রে ! আমি কবিতা ভীষণ ভালবাসি । আর আমায়
নিয়ে কেউ কবিতা লিখছে ... কি রোমানটিক ! আরনাভ তুই আমায় সরাসরি কেন জানাস নি এসব
বল?? কি রে বল?”
-“মানে তুই যদি আমায় ভুল বুঝিস তাই আর কি
বলিনি । এসব এ জড়ালে ক্ষতি হতো......”আমার কথাটা শেষ হওয়ার আগেই দিওতিমা বলে উঠল ,” জাহাপানা তু সি গ্রেট হো, আরে তোর কোন আইডিয়া আছে
তুই কত ভালো লিখিস ?! কিন্তু কি ক্ষতি হতো জানলে ঠিক বুঝলাম না !”
এই মেয়েকে কি করে বুঝাব আমি নিজেই বুঝতে
পারছিনা। আমার মনে হয় ছেলেরা প্রেম নিবেদন করতে যতনা ভয় পায় তার চেয়ে বেশী ভয় পায়
রিজেক্টেড হতে !
বলবো কি বলবো না এই দোলাচল হচ্ছিলো মনের
মধ্যে । ও আমার হাতটা ধরে ফেললো হঠাৎ । আমার শরীরে কেমন একটা অনুভূতি হচ্ছে ভাষায়
প্রকাশ করা সম্ভব নয় । মনে হচ্ছে শুধু এই সময়টা যেন দীর্ঘতর হোক, এর জন্যেই
অপেক্ষায় ছিলাম কি? জীবনের বামপক্ষ ইকূয়াল টু ডানপক্ষ কি হতে চলেছে?
“ তুই আর একটা কবিতা লিখে দিবি আমার হয়ে ?
আমি ভালো লিখতে পারিনা ,প্লীজ বন্ধু!”
বন্ধু মাণে? কি বলতে চায় ও? ওর টলটলে
চোখটার দিকে একরাশ প্রশ্ন নিয়ে তাকালাম ।
ও অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে বলল ,”দেখ আমার
দাদার বন্ধু শাহেলদাকে আমার খুব ভালো লাগে । দাদাও আমাকে ভালোবাসে,বুঝি । আমাদের
দুজনেরই কবিতা খুব প্রিয় ,তাই তুই যদি আমার হয়ে প্রেমিকার মনের কথা ব্যক্ত করে
একটা কবিতা লিখে দিস , ভালো হয় রে ,দিবি?”
মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লে আমি বোধহয় সামলে
নিতাম ,এ কথা শোনার পর আমার মাথা কাজ করাই বন্ধ করে দিলো! আমার সব জল্পনা কল্পনায়
ছাই পরে গেল । নিজেকে একইসাথে মূর্খ , অপমানিত, ক্যাবলা আরও অনেক কিছু লাগছিলো।
এতো দিনে এটাও বুঝতে পারলাম কেন এই দেবী তার ভক্তদের পাত্তা দেন না! যে হাতটা ধরার
জন্য ব্যাকুল ছিলাম সেই হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে নিতে বললাম ক্ষীণ স্বরে ,” সে
দেখা যাবে খন !” বলেই সাইকেল নিয়ে সামনের দিকে হাঁটা দিলাম পিছনে একা দিওতিমাকে রেখে । জানিনা ও ইচ্ছে করে আমায়
ফ্রেন্ডজোনড করল কিনা, জানিনা ও অপমান করল কি না ,জানিনা ও ঠিক কি ভুল বলছে ,কিছু
জানিনা আর জানতেও চাইনা আমি ,শুধু এটা ভেবে নিজের ওপর রাগ হচ্ছে কারুর সম্পর্কে
ঠিক করে না জেনেই কেন আমি এতো দূর ভেবে ফেললাম ? ভালোলাগা, ভালোবাসা এই বিষয়গুলো
মনে হয় কোন সূত্র মেনে চলেনা ।
আচমকা মনে হল কেউ আমার সামনে এসে দাঁড়ালো,
মাটি থেকে চোখ তুলে দেখি পিয়াল। হাঁ , ওর কথাতেই তো আজ এখানে আগে ভাগে আসা, ভুল
মেরে গেছিলাম । মুখটাকে যতদূর সম্ভব স্বাভাবিক করার চেষ্টা করলাম। এ মেয়ে কিছু
জানানো কোনোমতেই চলবেনা !
ও এসেই প্রথমে বলে বসলো, “ কি রে দিওতিমার
সাথে কি গুজগুজ ফুসফুস করছিলি রে? ঢপ দিবি না কিন্তু। “( গুরুমা এসেছেন আমার !)
কেন জানিনা হঠাৎ কি মনে হল বলে বসলাম , ‘’
ও বলেছে আমায় কবিতা লিখে দিতে ওর বি এফ এর জন্য । “
“তুই কবিতা লিখিস ? আমি জানতাম না তো ! ও
জানল কি করে? আর ওর বি এফ আছে?তাই জানিনা! বাব্বা ও মেয়ের পেটে পেটে এতো,মানুষ
চেনাই দায় !” এক নিশ্বাসে বলে গেলো পিয়াল।
“ ও জানল কি করে আমি জানিনা। লিটল
ম্যাগাজিনে পরেছে হয়তো !” কথাটা মিথ্যা নয় কারণ বহু দিন আগে সখ করে কবিতা একটা দিয়েছিলাম
বটে ,ছেপেছিল ,আর আমি এটাও জানি পিয়াল দেবী এসব থেকে শত হস্ত দূরে তাই চাপ নেই ।
উলটে এটা বুঝলাম যে গলায় গলায় বন্ধু হয়েও বি এফ এর খবর জানেনা পিয়াল । এর কারণ কি
হতে পারে তা নিয়ে মাথা ঘামালাম না আর। যেটা আমার নয়,আর হবেনা কোনোদিনও সেটা নিয়ে
ভাবাভাবি করাটাও বোকামো ।(এই ক মিনিটে বিশাল বুঝে গেছি আমি !!)
যাই হোক পিয়াল এবার ওর ব্যাগ থেকে ১ টা
ভাঁজ করা কাগজ বের করে দিল আমার হাতে ।
“ এটা কি?” আমি বললাম।
“ অ্যাটম বোম এর ফরমুলা !!নে...। ” বলেই
খিলখিল করে হাসল ।
আমার হাসার মুড নেই। তাই রাফ ভাবেই বললাম,
‘’ বল কি এটা?”
“ অঙ্ক আছে। আমিও কিছু পড়াশোনা করি । তুই
সবারটাই করে দিস ।আমিও বা বাদ থাকি কেন? “ ও যে খোঁটা দিল সে বুঝলাম ,কিন্তু মুখে
কিছুই বললামনা। কাগজটা
বুক পকেটে রাখলাম।
“এই জিনিস দেওয়ার জন্য......? দুরর স্কুলে
ও দিতে পারতিস !” আমি বললাম।
“ তখনও রেডি হয়নি তাই দিতে পারিনি। বাড়ি
গিয়েই করে ফেলিস কেমন ?”এই বলে পিয়াল হাসতে হাসতে চলে গেলো। পাগলি মেয়ে একটা!
ছটা বেজে দশ হয়ে গেছে ।
অদূরেই দেখলাম পলু শয়তানটা দাঁড়িয়ে আছে।
দেখেই এক গাল হেসে বলল, “ কি রে তোর দেবী পটলো?কেমন দিলাম বল??”
“মেরে দাঁত ভেঙ্গে দেব তোর কি হয়েছে
জানিস?” রাগটা চাগিয়ে উঠল ! ঘটনা শুনে পলু থ!
‘’ভাই আমি এসব জানতাম না । ভাবলাম তোর
সাথে ওকে সেট করে দেবো। হয় গোল হত নয় ফাউল ! মাঝখান থেকে এটা কি হল ? সরি আমি এটা
এক্সপেক্ট করিনি !” পলু র গলায় আমার জন্য বিষাদ ঝরে পড়ল । তাও কাউকে বলে তো জ্বালা
মিটল ।
পলু হঠাৎ বলে বসলো,” তা পিয়াল ডাকল কেন আজ
?” কাগজটা দেখিয়ে কারণটা বললাম। পিয়াল এর হাতের ছোঁয়া
লেগে থাকা কাগজ এর জন্য পলু ছোঁ মেরে সেটা নিলো ।
সেটা খুলতে খুলতে বলল,” ভাই তুই এই কর ।
পড়াশোনা করে কি লাভ? টিউশন কর ,মেয়েদের অংক কষে দে, মালামাল হয়ে যাবি!”
কষে গালি দিতে যাচ্ছিলাম ওকে, কিন্তু
কাগজের অংক দেখে আমার মাথায় বিনা মেঘে বাজ পড়লো। এ যে পিয়াল এর চিঠি।
প্রেমপত্র!!!!!!! আজ আমি কার মুখ দেখে ঘুম থেকে উঠেছিলাম মনে পড়লোনা।এক একটা দিন এমন
থাকে যেদিন সব কিছু ঘেঁটে যায় আজ তেমনি একটা দিন । আধো আলো আধো ছায়ায় বেশ বুঝলাম জোর
কা ঝটকা লেগেছে আমার বন্ধুটিরও । একদমে পড়ে ফেললাম ~
“ আরণাভ
আমায় তুই ভুল বুঝিস না। আমার তোকে ভালো
লাগত ক্লাস নাইন থেকেই, সেটা তীব্র হয় এই দুই বছরে ,তুই হয়তো বুঝিস নি কিন্তু আর
কত দিন চেপে রাখবো বল মনের কথা মনে? তাই লিখে ফেললাম এটা। তাই তোকে জিজ্ঞেস করতাম
বারবার আর কাঊকে ভালবাসিস কিনা। দিওতিমা তোকে সেই নজরে দেখে না আমি জানি, তোর মতটা
জানার জন্য অপেক্ষায় রইলাম ,কালকের মধ্যে জবাব না দিলে মারবো কিন্তু ( আমি ফাটছি
ভীতরে ভীতরে) !! শেষে ঐ ন্যাকামো করে লিখবো আই লাভ ইউ? হাসিস না প্লীজ । আমাকে জি
এফ হিসাবে না পোষালে সরাসরি বলে দিস।কেমন?( কাল ঈঈঈঈ!!)
ইতি ~ তোর পিয়াল “
পলু আমার দিকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকাল ।
তারপর শুকনো হাসি ফুটিয়ে মুখে টেনে টেনে বলল, “কি কপাল রে! একজন গেলো আরেক জন এসে
পড়লো।“ এ যেন চেইন রি অ্যাকশন চলছে, পলু পিয়াল কে ভালবাসে, পিয়াল আমায়। আমি
দিওতিমা কে ও আবার ওর কোন এক দাদার বন্ধু কে ! কি কিচাইন!
পিয়াল এর এইসব ফিল্মি কায়দার সাথে আমার
সদ্য পরিচয় আর পাশে থাকা পলুর দুঃখের হাসিটা আমায় বোঝাল যে আজ আর পড়া হবেনা। ডাবল
শক খেয়েছি আজ আমি। পলুও খেয়েছে। ওর হাত ধরে বললাম “ চল আজ ছাত্র সঙ্ঘের ঠেকে যাই ।
না খেলে আজ মাথার ঝড় থামবেনা!’’
কারণবারি আমার পেটে সহ্য হয়না আর খেয়ে
বাড়ি ঢোকা চরম রিস্ক , ধরা পরলে বেঘোরে প্রাণ যেতে পারে বাবার হাতে কিন্তু তাও আজ
সান্ত্বনার দরকার । সস্তার হলুদ তরল এর দরকার। দুজনেরই।
নেশা খুব বেশি করিনা, তবে আজ খেয়েও নেশা
হচ্ছেনা।তাও খেলাম না আর। বাড়ি ঢুকেই মাথা ব্যাথা করছে বলে না খেয়ে নিজের ঘরে দোর
দিয়ে শুয়ে পড়লাম, বাবা বাড়ি ফেরার আগেই। মার সাথে দূরত্ব বজায় রেখে কথা বলতে
হচ্ছিলো। শুয়ে শুয়ে ভাবলাম কি জবাব দেব আমি ওই পাগলি টাকে । কষ্ট দেওয়ার ইচ্ছে নেই
কিন্তু এটা সত্যি ওর জন্য প্রেম আসেনা আমার মনে। শুধুই বন্ধু ভাবি । পলু আজ গম্ভীর
ভাবে ছিল বাকিটা পথ।কথাও বলেনি বিশেষ।মদ খেয়েও গুম হয়ে ছিল। ওর মনে কি চলছে আন্দাজ
করতে পারছিলাম কিন্তু আমার কি করণীয় তা ক্লিয়ার হচ্ছেনা। কি জবাব দেব কাল?কি? মানব
সম্পর্কগুলো যেন ‘ ধাঁধাঁর থেকেও জটিল’!
সারাটা রাত ঘুম হয়নি ঠিক করে,তাও আজ স্কুল
এ যেতেই হবে।রাতে খাইনি বলে চোঁ চোঁ করে খিদে পেয়েছিলো। সকালে পড়া ছিল না কোনও।
দেরি করে উঠলাম বিছানা ছেড়ে। বাবা বেরিয়ে গেছে কাজে।মা দেখলাম গজগজ করছে। কালকে
আমার না খাওয়া, দেরি করে ওঠা আর পড়াশোনা না করা সব কিছুকে এক সূত্রে বেঁধে একতরফা
বকে গেলো আর আমি এক কান দিয়ে শুনে অন্য কান দিয়ে বের করে দিলাম ( কানে ফিলটার
লাগান আছে!!) ভাত মাছের ঝোল খেয়ে চান করে সুবোধ বালক এর মত স্কুল এর পথে হাঁটা
দিলাম। পলু দেখলাম এখনও দেবদাস অবস্থায় আছে আর পিয়াল মাঝে মাঝে এদিক ওদিক দিয়ে
আমার দিকে তাকাচ্ছে ।
টিফিন বেলায় পিয়াল কে পাকড়ালাম। ও যেন
রেজাল্ট এর অপেক্ষায় বসে আছে। কাছে যেতেই বলল, ‘’কি রে পড়েছিস ওটা?”
“ হুম” ।
“তুই রাগ করেছিস? বলনা !” ওর কণ্ঠে চাপা
একটা ভয় কি? বুঝলাম না!
“ না রাগ করিনি । তোর সাথে কিছু কথা আছে
পিছনের বাগানে চল !”আমি বললাম!( আপনা টাইম আ গেয়া ! আমিও ভাব মারতে জানি!!)
“ তুই কিছু ঈয়ে করবি না তো?” দুষ্টু
বাচ্চার মত হাসল পিয়াল । বলিউডি সিণেমার সাইড এফেক্ট এসব ।
“ কিছু ইয়ে টিয়ে না, তুই চল তো” বলে ওর
হাত টেনে নিয়ে চললাম বাগানে। বসলাম একটা নিরিবিলি গাছ এর তলায় । ঠাণ্ডা মাথায় পুরো
কেস টা হ্যান্ডল করতে হবে।
তার
ওপর কাল কের হ্যাং ওভার এখনও কাটেনি মাথার রগ দুটো দপদপ করছে ।তাও যা করার আজই করতে হবে ।( ডি ডে আজ !!)
পিয়াল লক্ষ্মী মেয়ের মতন আমার দিকে তাকিয়ে
আছে।
মেয়েদের
মনের ভাব বোঝা বড়ই ডিফিকালট ব্যাপার ! গলাটা খাকরে
, গালের নরম দাড়িতে হাত বুলিয়ে ওকে বললাম,” এসব
চিঠি ফিঠির কি প্রয়োজন ছিল? যা বলার সামনা সামনি বললেই তো পারতিস
।
তোর
মতন ডাকাবুকো টাইপের মেয়ের থেকে এমন অদ্ভুত কাণ্ড কারখানা রীতিমতো আনএক্সপেকটেড ছিল
আমার কাছে !!”
“শুধু মাত্র এই কারণে তুই আমায় রিজেকট করে
দিবি বুঝি ?” পিয়াল জানতে চায় ।
‘’ না সেটা নয় । আমি
তোকে রিজেকট করে দেব একবারও বলেছি?”
“ তাইলে তুইও আমায় ভালবাসিস? আমি জানতাম
!! আমার মন বলছিল !!” পিয়াল উল্লাসে ফেটে পড়ল ।
আমি বুঝলাম না ও কি করে এত তাড়াতাড়ি এই চরম
সিধান্তে পৌঁছে গেলো?! সত্যি মেয়েটাকে নিয়ে আর পারা গেলনা !
“ আমি তোকে বন্ধু ভাবি শুধুই বন্ধু । এর বেশি দাবি করিস না আমার থেকে তুই ।
একজন বন্ধু কেও ভালবাসা যায় ,বন্ধুত্বের কোনও জেনডার হয়না , জানিস না ?” নিজেকে
দার্শনিক প্রমাণ এর ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা হিসাবে এটাকে ভাবলে ভুল করবেন । সত্যিটা বলে
দেওয়া ভালো সেটা যতই কঠিন হোক না কেন ! নইলে আজ ওর দাবি মেনে নিলে পরে যখন ও বুঝবে
ও যা চায় তা দেওয়ার ক্ষমতা আমার মতন সাধারণ নিম্নবিত্ত পরিবার এর ছেলের নেই তখন ও
কষ্ট পাবে ! মেয়েটা যতই বাইরে বাইরে নিজেকে কঠিন করে রাখুক না কেন ওর মনের ভিতরে
যে ইমোশনের ওশান আছে সে বিষয়ে আমার বিন্দু মাত্র দ্বিধা নেই ।
“তুই আমাকে কাটিয়ে দিচ্ছিস?” পিয়াল স্পষ্ট
ভাবে জানতে চাইল ,” বল কি দোষ আমার? আমি টম বয় টাইপ বলে , তোর দিওতিমার মতন মারকাটারি সুন্দরী নই বলে? তোরা
সব ছেলেরা এক আমার বোঝা হয়ে গেছে!”
“ তুই আর কিছু বুঝিস না বুঝিস অসাধারণ রকম
ভুল বুঝতে পারিস !” আমি হাল্কা হেসে ভারি পরিবেশটাকে হাল্কা করার চেষ্টা করলাম ।
কে জানে মেয়েটা হয়তো এখনই আমার কথা শুনে কাঁদতে না বসে পরে । কাল থেকে সব কেমন যেন
উলটো পাল্টা হচ্ছে। তাই ঝড় কোন দিক দিয়ে আসবে আলিপুর আবহাওয়া দপ্তর ও তা বুঝতে
পারছেনা !
“তোর লুক এর জন্য নয় ব্যাপারটা আর আমি
তোকে কোনও অজুহাতও দিতে চাইনা কিন্তু সত্যিটা বলাটা আজ দরকার নইলে তোর এই ভুল
বোঝাটা পরবর্তী কালে আমাকে আর তোকে দুজনকেই কষ্ট দেবে !!”
দেখলাম ও চুপ করে গেছে ।আমি আবার বললাম
“পিয়াল তুই জানিস না পলু তোকে লাইক করে?”
ও মাথা নেড়ে বলল,” জানি,করে তবে আমি ওকে
সেই নজরে দেখি না, ক্লাস মেট ব্যাস!!”
“ আর ও কাল আমার সাথে তোর দেওয়া চিঠিটা পড়েছে । ও
শকড ভীষণ রকম । তুই আশা করি এটাও জানিস যে ও আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু তাই কথাটা
রূঢ় শোনালেও বলতে বাধ্য হচ্ছি আমি চাইনা কোনও ভাবেই আমাদের এই বন্ধুত্বটা কোনও
কারণ বশত টাল খাক !” কথাগুলো বলে ফেললাম এক নিশ্বাসে । বলতেই হত আজ! পলুকে আমি
হারাতে পারবনা । ও যদি আমার হয়ে স্যাক্রিফাইস করতে পারে আমিও পারি। জানি ভালবাসাটা
ক্যাডবেরির ভাগ নয় যে দেওয়া নেওয়া যায় কিন্তু পিয়ালকে আমি কোনও ভাবেই অ্যাকসেপ্ত
করতে পারবনা । জীবনটা পুতুল খেলা নয় , যে
খেলনা পোষালনা ফেলে দিলাম। আমি কাউকে ঠকাতে পারবনা ,প্রেমের ভান করতে পারবনা আর
হ্যাঁ এসব এর চক্করে পরে বাবা মার বিশ্বাসকে খাদে ফেলে দিতেও পারবনা । চেষ্টা
করলেই পিয়ালকে ভালোবাসতে পারতাম কিন্তু স্বার্থপরই না হয় হলাম একটু নিজের জন্য ,
পলুর জন্য , কিছুটা সেই মেয়েটার জন্যও যাকে পাবনা জেনেও আমি কবিতা লিখতাম ।
ভালবাসাটা জোর করে আসেনা অর্জন করতে হয় ।
পিয়াল দেখলাম শান্ত হয়ে গেছে। মুখ নিচু
করে মাঠের কচি ঘাস ছিঁড়ছে । ও দুঃখ পেল? হঠাৎ কি মনে হল ওর ওই জানে মাথা তুলে বলল, “ তা
হলে আমার সাথে তোর কথা নেই আর? আমি উঠি তবে !”
“ না উঠবিনা তুই। বস চুপ করে। কথা নেই
মানেটা কি?” আমি বললাম।
“ কিছুনা ছাড় ।আমারই ভুল তোকে এসব বলা সরি
!” ও ঠাণ্ডা গলায় জবাব দিল ।
“ উঁহু তুই যা করেছিস , ঠিক করেছিস । মনে
যা এসেছিল বলে দিয়েছিস । আমি কখন বললাম তোর সাথে আর কথা বলবনা ? পাগলি তুই?বরং আজ
থেকে আমি আর তুই আর ভালো বন্ধু হলাম । সব কথা শেয়ার করবি আমায় না করলে গাট্টা খাবি
”! নিজেকে কেমন অভিভাবক মনে হচ্ছে । একদিনে বড় হয়ে গেলাম বুঝি অনেক টা??
“তবে
কেন আমায় .........” ওর গলা ধরে এল । আজ ওকে সত্যিকার এর মেয়ে মনে হচ্ছে যে জানে
যে সে এমন একজনকে ভালবাসে যে তার জন্য নয়,তাও পেতে ছায়...।কেন? কেন? আমি কি করব?
আমার কিছু করার আগেই বুঝলাম নদীর বাঁধ
ভেঙ্গেছে। পিয়াল হঠাৎ আমাকে জরিয়ে ধরে কাঁদছে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে ! অন্য এর বেলায় হলে
বলতাম সিন ক্রিয়েট করছে, কিন্তু নিজের বেলায় মনে হল না এই কান্নাটা ওর একান্ত
নিজের,যার মধ্যে অভিমান,যন্ত্রণা, ভালবাসা, না বলা কথা সব মিলে মিশে একা কার হয়ে
গেছে। মনে পরে গেলো দিদির কথা, ও মাঝে মাঝে এমন করে কাঁদত, তখন বুঝিনি কারণটা আজ
বুঝি । আমি ভিতরে ভিতরে ভাঙছি কি কোথাও ? খেয়াল পড়ল এরম করে জড়িয়ে ধরে কাঁদলে আর
কেউ সেটা দেখে ফেললে কেলেঙ্কারির এক শেষ হবে ! পিয়ালকে বুক থেকে ছাড়ালাম । ওর
নারীত্ব যেন আজ আমার কাছে শান্তি খুঁজছিল ,জানি না আদৌ কতটুকু ছায়া দিতে পারলাম
তবে ওর ভালবাসাকে নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে চাইনি আমি । ও একদিন না একদিন ঠিক বুঝবে......!!
এক জীবনে কি আর সবকিছু পাওয়া যায় ?
