Large story


                 তোমায় নিয়েই গল্প হোক


পর্ব~ ১  

  সেই তুমি কেন এত অচেনা  হলে?

টুং করে আওয়াজ হতেই প্রিয়ানা তড়িঘড়ি হাতে নিয়ে ফোনটা চেক করতে লাগলনাহ,’তারমেসেজ আসেনিদিঠি টেক্সট করেছে,”কি রে কলেজ এত ডুব মারছিস কেন?” এক সপ্তাহ সে কলেজের রাস্তা মাড়ায়নি কিন্তু কেন প্রশ্নের সঠিক জবাব নিজেই কি সে জানে?স্ক্রিনের আলোর দিকে তাকিয়ে থাকল একদৃষ্টে তারনামের পাশে সবুজ আলো জ্বলতে দেখাই যায়না আর,ব্লক করে দিয়েছে এতটা আকস্মিক এবং অপ্রত্যাশিত ছিল সম্পূর্ন ব্যাপারটা যে প্রিয়ানার হ্যাং ওভার এখনও কাটেনি হঠাৎ আলাপ,তারপর রাতদিন চ্যাট, ফোনে কথা ঘন্টার পর ঘন্টা,সব যেন স্বপ্নের মত লাগছে এত দ্রুত ঘটনাপ্রবাহ এগিয়েছিল বলেই হয়ত তাকে থেমে যেতে হল?কিন্তু কেন ? কি দোষ ছিল প্রিয়ানার?ভুল কিছু তো সে বলেনি! আঘাত করতে চাইনি সে বরং বন্ধুর মতন বোঝাতে চেয়েছিল যে কারুর জন্য নিজেকে তিলে তিলে শেষ করে দেওয়ার মধ্যে কোনও সার্থকতা নেই পরক্ষনেই মনে হয়, “শুধু বন্ধুকি আদৌ ছিল সে? নাকি তার চেয়ে ঢের বেশি কিছু ছিল?ওর পরিবার পরিজন প্যাশান সবকিছু এই দিনে জেনে গিয়েছিল নিজের কথাও শেয়ার করেছিল কিন্তু এখন প্রিয়ানার মনে হচ্ছে আদৌ সে তারমনের তল বুঝতে পারেনি নইলে এমনটা কি হত?নিজেকে নিজের কাছেই তার ভীষণ ছোট লাগছেমনে হচ্ছে এসব ইমোশনাল অ্যাটাচমেন্ট জড়ানোটা বোকামোরই নামান্তর মাত্র এককালে প্রিয়ানা এসব অনলাইন আলাপচারিতার বিপক্ষে গলা ফাটাত শেষমেশ নিজেই সে এসবের মোহে জড়িয়ে পড়লনিজেকে প্রাকটিকাল বলতেই পছন্দ করত বাবা ছোটবেলায় মারা যান বলেই হয়তো সে ভিতরে ভিতরে প্রস্তুত করে নিয়েছিল সবরকম অবস্থায় নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার,লড়াই করার জন্য পড়াশোনা বা কেরিয়ার এর জন্য কোনদিনই মাকে মেয়ের পিছনে পড়ে থাকতে হয়নি বরং তিনি মেয়েকে অগাধ ভরসা করেন তথাকথিত টিনএজার সুলভ কোনও ভুলই সে করেনি , ধরি মাছ না ছুঁই পানি স্টাইল গা বাঁচিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার এই গুনের জন্যই হয়ত সমবয়স্কদের সাথে তার তেমন বনেনি বেপরোয়া নয় সে ,হয়তো একটু স্বার্থপর কিম্বা পরিণত নিজের সেরাটা বের করতে প্রিয়ানা সেন বদ্ধপরিকর
কি ভাবছেন মেয়েটা মেগালোম্যানিয়াক?মনে হওয়াটাই স্বাভাবিক , তা বলে বোর্ডের পরীক্ষার তাক লাগানো রেসাল্ট কে কি আপনি অগ্রাহ্য করতে পারবেন?যদি এখন আপনাকে জানাই যে এই কন্যা শিবপুরে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে আপনি নিশ্চয়ই তাকে একটু বাহবাই দেবেন ! নয় কি?
এত ভালো মেয়ে কেন এমন বোকামি করল প্রশ্ন কি জাগছেনা ? নিজেকে উজাড় করে কাউকে ভালবাসা কি অপরাধ? মোটেই নাকিন্তু যার জন্য এত ফিলিংস তার সম্পর্কে কতটা জানলে পরে  তাকে অ্যাপ্রোচ করাটা ঠিক? বহুদিন একসাথে একছাদের তলায় থেকেও অনেকসময় দেখা যায় নিজের কাছের মানুষেরাই আপনার মনের কথা বুঝে উঠতে পারছেনা তবে কি করে শুধুমাত্র একজনের কথার উপর ভিত্তি করে তাকে ভালবাসা যায় বলুন তো??যায়,অন্তত প্রিয়ানা বেসেছিল ভাল,শুধু মুখ ফুটে বলতে পারেনি কারণ সে নিজের অনুভূতিগুলো নিয়ে এত সচেতন আগে কোনোদিনও ছিলনা অথবা বলতে যাওয়ার আগেই সে চলে গেছে তাকে ছেড়ে, তাকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে কেন চলে গেছে তার উত্তর এখনওআমরা জানিনা,প্রিয়ানাও জানেনা শুধু জানে ছেলেটা বড় কষ্টে ছিলবাড়িতে পঙ্গু বাবার সেবা করত,জ্যাঠা কাকাদের গঞ্জনা শুনত,নিজের জেদে লেখা পড়া করে সে চাকরির পরীক্ষা দিত আর এর মধ্যে তার আরও বড় যন্ত্রণার জায়গা ছিল তার প্রেমিকার হঠাৎ বিয়ে হয়ে যাওয়া প্রিয়ানা তার সমস্ত কথা মন দিয়ে শুনত,মনে মনে চাইত তার জন্য কিছু করতে,কিভাবে মানুষটাকে শান্তি দেওয়া যায় সেই দায়ভার অজান্তেই সে নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিল হয়তো প্রিয়ানা নিজেও এই পৃথিবীতে খুব একলা অনুভব করত কলেজে বন্ধু ছিল না তা নয়, তবে কারুর সাথেই যেন তার ফ্রিকোয়েন্সি ম্যাচ করতনা দিঠি ভাল বন্ধু তবে একটু ছেলেমানুষ গোছের সব কথা শেয়ার করা যায়না ছেলেটার সাথে আলাপ হওয়ার পর নিজের মধ্যে আমূল পরিবর্তন দেখতে পেয়েছিল সে যে এত গুছিয়ে কথা বলতে পারে আগে জানত না কথায় কথায় একে অপরকে জানার মধ্যে একরকম অনির্বচনীয় সুখ আছে সেটাকেই সে ভালবাসা বলে ভুল করেছিল? কি ইনফ্যাটুয়েশন ছাড়া কিছুই নয়?ভাবতে ভাবতে চোখ বেয়ে জল নামে এই কদিনে অনেক কেঁদেছে সে শেষের চ্যাটটা খুব কম হলে দশবার পড়েছে ছেলেটার তরফ থেকেও যে নিছক বন্ধুত্ব ছিলনা তা তাদের কথোপকথনে স্পষ্ট রাত দুটো তিনটে অবধি কথা গড়িয়েছে যখন তাদের মধ্যেকিছু একটাচলছিল আপনি চোখ বুঝে বলে দিতে পারেন ছেলেটা এমনি ভালই ছিল কিন্তু প্রেমিকার শোক ভোলার জন্য মাঝে মধ্যে নেশা করত এটা আবার সে সদ্য বান্ধবীকে একদিন বলে ফেলেছিল প্রথমে এরম দেবদাস মার্কা আচরণের জন্য বকাঝকা করলেও পরে প্রিয়ানা আর উচ্চবাচ্য করেনি ঘটনার দিন রাত দেড়টার সময় বেহেড মাতাল হয়ে সখীকে কল করে বসেন এবং সম্ভবত অসংলগ্ন কথাও বলেন সখী যথারীতি মারাত্মক ক্ষেপে যান আর পরেরদিন কল করে এহেন অভব্য আচরণের জন্য একহাত নেন গোলমালের সূত্রপাত এখান থেকেই বারবার সে বলে ভুল হয়ে গেছে এমন আর হবেনা কিন্তু অবিরত জ্বালাময়ী বাক্যবানে ছেলের ছাপ্পান ইঞ্চ কা ইগো আহত হয় এবং তিনি রণে ভঙ্গ দিয়ে মামনিকে ব্লক করে দেন তারপর থেকে ফোন করলে যন্ত্র মানবীর কণ্ঠ এ ব্যস্ততার করুন সুর বেজেই চলেছে।প্রিয়ানা এই ভেবে সাত দিন সাত রাত কাবার করে দিয়েছে এইসব তুচ্ছ ইস্যুর জন্য গত সাত মাস ধরে গড়ে ওঠা নৈকট্যকে মানুষ কিভাবে এক লহমায় ঝেড়ে ফেলতে পারে?অনেক কথা তার মনে ঘোরাফেরা করে বেড়াচ্ছে। স্মৃতিমেদুর হয়ে পড়ছে ক্ষণে ক্ষণে। কারুর একটা ইথারীয়উপস্থিতিকে সে মিস করছে প্রচণ্ড। বাস্তববাদী মন পরিহাস করছে ক্রমাগত তাকে এটা ভালো হল না খারাপ?সে মানুষ চিনতে ভুল করল না দোষ তার? বেশি অধিকারবোধ ফলিয়ে ফেলেছে নাকি এত ভাব ভালবাসা গড়ে তোলাটাই অর্থহীন সে ভেবেই চলেছে ঘুমহীন চোখে মা সবটা বুঝতে না পারলেও এটা বুঝেছে যে মেয়ের মন ভালো নেইকিন্তু কিছু জিজ্ঞেস করেননি তিনি,মেয়েকে চেনেন ,খুব রিজার্ভ সে,মাকে কিছুই বলবেনা!  
এখন বলুন কার দোষ ?সেই বিক্রম বেতালের গল্পের মতন প্রশ্ন হয়ে গেলো না?!!এক কথায় এর জবাব হয়না আরও গভীরে যাওয়া দরকার অতঃপর প্রশ্নগুলোর উত্তর ভবিষ্যতের খাতায় তোলা থাক না হয়? ওদিকে প্রিয়ানার ফোন এ দিঠি ফোন করেই চলেছে।একটু চোখটা লেগে গিয়েছিল।ফোনটা ধরা মাত্র দিঠি চিৎকার করে উঠল, কি রে তোর কেস কি? ডুমুরের ফুল বনে গিয়েছিস যে বড়? মেসেজ পড়েও রিপ্লাই দিস না
এবারে মুখ থেকে প্রিয়ানার অজান্তেই বেরিয়ে গেলআসলে শরীরটা ভালো ছিলনা তো তাইডাহা মিথ্যে বলা যায়না একে মন ভালো ছিলনা যখন শরীর ভালো থাকে কোন সাহসে?
দিঠি হয়ত এরম গোছেরই কোন জবাব প্রত্যাশা করেছিল তাই বেশি মাথা ঘামাল না,দু একটা এদিক ওদিক কথা জিজ্ঞেস করেই আসল কথা পেড়ে বসল
শোন, কাল আমার বাড়িতে একটা পার্টি থ্রো করছি,আমার জন্মদিন উপলক্ষ্যে রাত আটটার মধ্যে চলে আসতেই হবে কিন্তু আমি কোন অজুহাত শুনবনা কলেজের অনেককেই ইনভাইট করেছি। তোর বোরিং লাগবেনা দেখিস!”
প্রিয়ানা তৎক্ষনাৎ বলে উঠল,” ওকে যাব কিন্তু অত রাতে বাড়ি থেকে একা ছাড়তে চায়না মা আমায়। আর তুই তো জানিস আমার জেঠুন কি কড়া । ম্যানেজ করে বেরোনো চাপের।
-“ তার মানে তুই কাটিয়ে দিচ্ছিস তাই তো? দাঁড়া তোর মজা দেখাচ্ছি।তুই কাকিমাকে ফোনটা দে আমি তোর পারমিশন করিয়ে দিচ্ছি!”
প্রিয়ানা মাকে ডেকে মোবাইলটা দিল। দিঠি অসাধারণ পট্টি পড়াতে পারে এ বিষয়ে সে নিঃসংশয়। মার টুকরো টুকরো কথা শুনে মনেই হচ্ছে যে মা অলমোস্ট রাজি। মা ফোনটা ফেরত দিয়ে মুখ টিপে হেসে চলে যেতেই প্রিয়ানা ফোন ধরে বলল ,” কি রে কি বোঝালি মা কে?”
-      তুই বেকার চাপ নিস না। কাকিমা রাজি আর তোকে একা আসতেও হবেনা। প্রজ্ঞানদাকেও নেমন্তন্ন করে দেব আমি। ভাই বোনে মিলে আমার বাড়ি চলে আসবি কেমন?”
-      দাদাভাই ? তুই তো ওকে মাত্র দু বার দেখেছিস,তাতেই নেমন্তন্ন করে দিবি?”
-      আরে তোর আসার বন্দোবস্ত করে দিলাম।আর তাছাড়া তোর দাদাকে হেব্বি হট দেখতে। অনেকটা আয়ুষ্মান খুরানার মতন ।আমি প্রথম দিন দেখেই ক্রাশ......”
-      -“তুই থামবি? দাদা আমাদের থেকে অনেক বড়,কম সে কম দশ বারো বছরের তো হবেই।তুইও পারিস বটে!”
-      আরে বয়েস বাড়লে ছেলেদের দেখতে আরও হ্যান্ডসাম হয়ে যায়।বুঝলি? তোর দাদার নাম্বারটা আমায় দে আমি বাতচিত করে নেবো!”
-      আচ্ছা জায়সি আপকি মর্জি! এত ব্যাবস্থা করছিস যখন যেতে তো হবেই ! এখন ছাড়ছি! টাটা!”
নাম্বারটা সেন্ড করে প্রিয়ানা বিছানায় উঠে বসল। সে যাবে ঠিক করেছে। এরম ভেঙ্গে পড়লে চলবেনা! বাইরে বেরিয়ে মন ঠিক করে নিয়ে আবার নতুন করে পথ চলা শুরু করতে হবে। পথ চলার শুরু মানে?এতদিন কি সে হাঁটা থামিয়ে দিয়েছিল ? ভাবতে ভাবতে মনটা উদাস হয়ে গেলো। পাশের বাড়ির রেডিওতে আইয়ুব বাচ্চুর গান বাজছে তখন...”সেই তুমি কেন এত অচেনা হলে?”
কেন অচেনা হলে?কেন?কেন?কেন?